ধ্বনি

বাংলা ব্যাকরণ

## ধ্বনি ও ধ্বনির প্রকারভেদঃ-

✿ ধ্বনি:
কোন ভাষার উচ্চারণের ক্ষুদ্রতম এককই হলো ধ্বনি। ভাষাকে বা ভাষার বাক প্রবাহকে বিশ্লেষণ করলে কতগুলো ক্ষুদ্রতম একক পওয়া যায় সেগুলোকে ধ্বনি বলে।
✿ ধ্বনির প্রকারভেদ:
ধ্বনি দুই প্রকার। যথা:
ক. স্বরধ্বনি
খ. ব্যঞ্জনধ্বনি
✿ স্বরধ্বনি:
যে সকল ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস কাড়িত বাতাস বেরিয়ে যেতে মুখবিবরের কোথাও কোন প্রকার বাধা পায় না, তাদেরকে বলা হয় স্বরধ্বনি।
বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনি ১১ টি।
✿ স্বরধ্বনির প্রকারভেদ:
স্বরধ্বনি দুই ভাগে বিভক্ত। যথা:
ক. মৌলিক স্বর
খ. যৌগিক স্বর
✿ মৌলিক স্বর:
যে স্বরধ্বনি একক ভাবে উচ্চারিত হয় তাকে মৌলিক স্বর বলে।
বাংলা ভাষায় মৌলিক স্বর ৯ টি। যথা: অ, অা, ই, ঈ উ, ঊ, ঋ, এ, ও।
✿ যৌগিক স্বর:
পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের সময় তা একটি সংযুক্ত স্বরধ্বনি রূপে উচ্চারিত হয় এ রূপে এক সঙ্গে উচ্চারিত দুটো স্বরধ্বনিকে যৌগিক স্বর বা সান্ধ্যক্ষর বা দ্বিস্বর বলা হয়।
বাংলা ভাষায় যৌগিক স্বর ২৫ টি।
✿ ব্যঞ্জন ধ্বনি:
যে সকল ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যেতে মুখবিবরের কোথাও না কোথাও বাধা পায় কিংবা ঘর্ষণ লাগে, তাদেরকে বলা হয় ব্যঞ্জনধ্বনি।
বাংলা ভাষায় ব্যঞ্জনধ্বনি ৩৯ টি।
✿ ব্যঞ্জনধ্বনির প্রকারভেদ:
● স্পর্শ ব্যঞ্জন বা স্পর্শধ্বনি:
ক থেকে ম পর্যন্ত প্রথম ২৫ টি ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারিত হওয়ার সময় ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস মুখগহবরের কোন না কোন জায়গা স্পর্শ করে যায়। এজন্য এই ২৫টি ধ্বনিকে বলা হয় স্পর্শধ্বনি বা স্পৃষ্টধ্বনি।
ক-ম পর্যন্ত ২৫ টি ধ্বনিকে পাঁচটি বর্গ বা গুচ্ছে বিভক্ত করা হয়েছে যেখানে প্রতিটি বর্গে পাঁচটি করে ধ্বনি অাছে।
◆ ক-বর্গীয় ধ্বনি: ক, খ, গ, ঘ, ঙ এ পাঁচটি ধ্বনিকে ক-বর্গীয় ধ্বনি বলে। ক-বর্গীয় ধ্বনি জিহবার গোড়ার দিকে নরম তালুর পশ্চাৎ ভাগ স্পর্শ করে উচ্চারিত হয়। ক-বর্গীয় ধ্বনিকে জিহবামুলীয় বা কণ্ঠ্য ধ্বনি বলে।
◆ চ-বর্গীয় ধ্বনি: চ, ছ, জ, ঝ, ঞ এ পাঁচটি ধ্বনিকে চ-বর্গীয় ধ্বনি বলে। চ-বর্গীয় ধ্বনি জিহাবার অগ্রভাগ চ্যাপটা ভাবে তালুর সম্মুখ ভাগের সঙ্গে সংঘর্ষ করে উচ্চারিত হয়। এদের তালব্য স্পর্শধ্বনিও বলে।
◆ ট-বর্গীয় ধ্বনি: ট, ঠ, ড, ঢ, ণ এ পাঁচটি ধ্বনিকে একত্রে ট-বর্গীয় ধ্বনি বলে। ট-বর্গীয় ধ্বনি জিহবার অগ্রভাগ কিঞ্চিৎ উল্টিয়ে ওপরের মাড়ির গোড়ার শক্ত অংশকে স্পর্শ করে উচ্চারিত হয়। ট-বর্গীয় ধ্বনিকে দন্তমূলীয় প্রতিবেষ্টিত ধ্বনি বা মূর্ধন্য ধ্বনিও বলা হয়।
◆ ত-বর্গীয় ধ্বনি: ত, থ, দ, ধ, ন এ পাঁচটি ধ্বনিকে একত্রে ত-বর্গীয় ধ্বনি বলে। ত-বর্গীয় ধ্বনি জিহবা সম্মুখে প্রসারিত হয় এবং অগ্রভাগ ওপরের দাঁতের পাটির গোড়ার দিকে স্পর্শ করে উচ্চারিত হয়। ত-বর্গীয় ধ্বনিকে দন্ত্য ধ্বনিও বলা হয়।
◆ প-বর্গীয় ধ্বনি: প, ফ, ব, ভ, ম এ পাঁচটি ধ্বনিকে একত্রে প-বর্গীয় ধ্বনি বলে। প-বর্গীয় ধ্বনি ওষ্ঠর সঙ্গে অধরের স্পর্শ ঘটে উচ্চারিত হয়। প-বর্গীয় ধ্বনিকে ওষ্ঠ্য ধ্বনিও বলা হয়।
● উচ্চারণের ভিত্তিতে স্পর্শধ্বনিকে দুই ভাগে ভাগ বিভক্ত।
ক. অঘোষধ্বনি
খ. ঘোষধ্বনি
◆ অঘোষধ্বনি: আর যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয় না, তাদেরকে অঘোষ ধ্বনি বলে।
অঘোষধ্বনি ধ্বনিগুলো হলো: ক, খ, চ, ছ, ট, ঠ, ত, থ, প, ফ।
◆ ঘোষধ্বনি: যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয়, তাদেরকে ঘোষ ধ্বনি বলে।
ঘোষধ্বনিগুলো হলো : গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ঞ, ড, ঢ, ণ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম।
● স্থায়ীকালের ভিত্তিতে স্পর্শধ্বনিকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
ক. অল্পপ্রাণ ধ্বনি
খ. মহাপ্রাণ ধ্বনি
◆ অল্পপ্রাণ ধ্বনি: কোন কোন ধ্বনি উচ্চারণের সময় নিঃশ্বাস জোরে সংযোজিত হয় না সে ধ্বনিগুলোকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে।
অল্পপ্রাণ ধ্বনিগুলো হলো : ক, গ, চ, জ, ট, ড, ত, দ, প, ব।
◆ মহাপ্রাণ ধ্বনি : কোন কোন ধ্বনি উচ্চারণের সময় নিঃশ্বাস জোরে সংযোজিত হয়, সে ধ্বনিগুলোকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে।
মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলো হলো :খ, ঘ, ছ, ঝ, ঠ, ঢ, থ, ধ, ফ, ভ।
● নাসিক্য ধ্বনি: যেসব ধ্বনি উচ্চারণে নাক ও মুখ দিয়ে কিংবা কেবল নাক দিয়ে ফুসফুস তাড়িত বায়ু বের হয়ে উচ্চারিত হয় সে ধ্বনিগুলোকে নাসিক্য ধ্বনি বলে।
নাসিক্য ধ্বনিগুলো হলো : ঙ, ঞ, ণ, ন, ম।
● উষ্মধ্বনি : যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় অামরা শ্বাস যতক্ষণ খুশি রাখতে পারি, সে ধ্বনিগুলোকে উষ্মধ্বনি বলে।
উষ্মধ্বনিগুলো হলো শ, ষ, স, হ।
● অস্তঃস্থ ধ্বনি: যে সব ধ্বনির উচ্চারণ স্পর্শ ও উষ্মধ্বনির মাঝামাঝি তাদেরকে অস্তঃস্থ ধ্বনি বলে।
অন্তঃস্থ ধ্বনিগুলো হলো: য, র, ল, ব।
● তালব্য ধ্বনি: যে ধ্বনি সাধারণত সম্মুখ তালু স্পর্শ করে উচ্চারিত হয় তাকে তালব্য ধ্বনি বলে।
তালব্য ধ্বনি হলো: য।
● তাড়জাতধ্বনি : যে ধ্বনি জিহবার অগ্রভাগকে কম্পিত করে এবং তদ্বারা দন্তমূলকে একাধিক বার দ্রুত অাঘাত করে উচ্চারিত হয় তাকে তাড়নজাতধ্বনি বলে।
তাড়নজাত ধ্বনি হলো : র।
● পার্শ্বিক ধ্বনি : যে ধ্বনি জিহবার অগ্রভাগকে মুখের মাঝামাঝি দন্তমূলে ঠেকিয়ে রেখে জিহবার এক বা দু পাশ দিয়ে মুখবিবর থেকে বায়ু বের হয়ে উচ্চারিত হয় তাকে পার্শ্বিক ধ্বনি বলে।
পার্শ্বিক ধ্বনি হলো : ল।
● উষ্ম ঘোষধ্বনি: যে উষ্মধ্বনি উন্মুক্ত কণ্ঠের মধ্যে দিয়ে বাতাস জোরে নির্গত হয়ে উচ্চারিত হয় তাকে উষ্মঘোষ ধ্বনি বলে।
উষ্মঘোষ ধ্বনি হলো : হ।
● তাড়নজাতধ্বনি: যে ধ্বনি জিহবার অগ্রভাগের তলদেশ দ্বারা ওপরের দন্তমূলে দ্রুত অাঘাত বা তাড়না করে উচ্চারিত হয় তাকে তাড়নজাত ধ্বনি বলে।
তাড়নজাতধ্বনি গুলো হলো : ড়, ঢ়।
● পরাশ্রয়ী ধ্বনি: যে ধ্বনি অন্য ধ্বনির আশ্রয়ে উপস্থাপিত হয় উচ্চারিত হয় তাকে পরাশ্রূী ধ্বনি বলে।
পরাশ্রয়ী ধ্বনিগুলো হলো: ং, ঃ এবং ঁ ।
● অনুনাসিক ধ্বনি: যে ধ্বনি স্বরধ্বনির অনুনাসিকতার দ্যোতনা করে তাকে অনুনাসিক ধ্বনি বলে।
অনুনাসিক ধ্বনি হলো : ঁ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *