বাংলা ভাষা

বাংলা ব্যাকরণ
মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বাগযন্ত্রের মাধ্যমে  উচ্চারিত অর্থবোধক আওয়াজ বা ধ্বনিকে  ভাষা বলে
বাগযন্ত্র :-যেসব তন্ত্রের সাহায্য ধ্বনি বা আওয়াজ সৃষ্টি হয় তাকে বাগযন্ত্র বলে। যেমন:- নাক বা নাসিকা, ঠোঁট, তালু, দন্ত বা দাঁত, ফুসফুস, গলবিল ইত্যাদি।
 
ধ্বনি :- যে কোনো ধরণের আওয়াজকে ধ্বনি বলে। যেমন -মানুষের ভাষার ক্ষুদ্রতম ধ্বনি, বন্দুকের ধ্বনি, নূপুরের ধ্বনি, বজ্রপাতের ধ্বনি ইত্যাদি। 
 
ভাষার দেশ, কাল এবং পরিবেশভেদে পার্থক্য এবং পরিবর্তন ঘটে। এক্ষেত্রে ব্যাকরণের ভূমিকা হলো ভাষাকে নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে না রেখে পরিবর্তনের ধারায় ভাষাকে সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও জীবন্ত করে রাখা। অর্থাৎ ব্যাকরণ ভাষাকে নির্দেশ দেয় না বরং ভাষার বিষয়কে সঠিকভাবে উপস্থাপন এবং বর্ণনা করে মাত্র।
ভাষায় ব্যাকরণ ব্যবহার খুব বেশি পুরনো না। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য ইউরোপীয় বণিক গোষ্ঠী ও মিশনারিরা বাংলা ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে মানোএল দা আস্সুম্পসাঁও রচিত ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পর্তুগিজ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেস’ প্রথম বাংলা ব্যাকরণ ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে  পুর্তুগালের রাজধানী লিসবনে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়ে থাকে।
 
এরপর হুগলি থেকে ১৭৭৮ সালে ন্যাথেনিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয় যা সর্ম্পূণ ইংরেজী রচিত হয়। তবে চার্লস উইলকিনসন এবং পঞ্চানন কর্মকারের যৌথ প্রচেষ্টায় ছাপাখানার জন্য প্রবর্তিত বাংলা হরফের সাহয্যে উদাহরণগুলো মুদ্রিত হয়। 
 
২০ শতকের দিকে আবার বাংলা ভাষা এবং ব্যাকরণ এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। 
তারপর ১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরি-র ব্যাকরণ এবং
 ১৮১৬ সালে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্যের ব্যাকরণ রচিত হয়। ১৮৩৩ সালে কলকাতার স্কুল বুক সোসাইটি ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ শীর্ষক রাজা রামমোহনের লেখা ব্যাকরণ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ড. সুনীতি কুমার  চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুকুমার সেন, ড. এনামুল হক প্রমুখ বাংলা ব্যাকরণ লিখেছেন।
বাংলা ভাষার ইতিহাস প্রায় ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ এই ভাষার আদি নির্দশন। বাংলা ভাষার লিপি হলো বাংলা লিপি।
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। তাদের মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। ভাষাভাষীর জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা ভাষা বৃহৎ চতুর্থ  মাতৃভাষা।  পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি লোকের ভাষা বাংলা ।
বাংলা  মাতৃভাষী —-৩০  কোটি
  তার মধ্যে  বাংলাদেশে ১৬ কোটি (২০১৬)
                           ভারত ১০ কোটি (২০১১)                                   নেপাল ২১, ০৬১ হাজার (২০১১)
 ভাষার পরিবার
             ইন্দো – ইউরােপীয়
              ইন্দো ইরানীয়
              ইন্দো – আর্য
              পূর্ব ইন্দো – আর্য
                বাংলা অসমীয়া
                          বাংলা
বাংলা ভাষার পূর্বসূরীরা হলো.. পালি, প্রাকৃত অপভ্রংশ,  অবহঠঠ,  পুরণবাংলা।
                     বাংলা ভাষারীতি
ভাষার ধর্মই হচ্ছে বলদে যাওয়া । ভাষার এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একদিন অপভ্রংশ থেকে জন্ম নিয়েছিলো আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। আবার ভাষার এভাবে বদলে যাওয়ার কারণে এদের ভাষাগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়।  যেমন – বর্তমানে ব্যবহৃত বাংলা ভাষারীতি ২টি- আঞ্চলিক কথ্য রীতি ও প্রমিত চলিত ভাষারীতি।
প্রমিত চলিত ভাষারীতি – দেশের সকল মানুষ যে আদর্শ ভাষারীতিতে কথা বলে, যেই ভাষারীতি সকলে বোঝে, এবং যে ভাষায় সকলে শিল্প-সাহিত্য রচনা ও শিক্ষা ও অন্যান্য কাজকর্ম সম্পাদন করে, সেটিই প্রমিত চলিত ভাষারীতি।

বাংলা প্রমিত চলিত ভাষারীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভাগীরথী-তীরবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষার উপর ভিত্তি করে। তবে তা , আগে  এই ভাষার সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। তখন কেবল সাধু ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা হতো। এই কারণে বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও ছোটগল্পকাররা সাধু ভাষায় উপন্যাস, নাটক ও গল্প লিখেছেন। পরবর্তীতে,  প্রমথ চৌধরী  চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনার উপর ব্যাপক জোর দেন এবং তাঁর সবুজপত্র (১৯১৪)  সালে পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনা শুরু হয়। 

আঞ্চলিক কথ্য রীতি :-বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজেদের মধ্যে যে বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাকেই আঞ্চলিক কথ্য রীতি বা আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বলে । প্রকৃতঅর্থে, প্রমিত চলিত ভাষারীতিও একটি অঞ্চলের কথ্য রীতির উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

তবে আঞ্চলিক কথ্য রীতি লেখ্য ভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, সেটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়, সকল অঞ্চলের মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বুঝবে না। সম্পূর্ণ একটি আঞ্চলিক ভাষায় রচিত একটি শিল্পসম্মত উপন্যাস হলো ( হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’)।

বাংলা ভাষারীতিতে আরেকটি দিন দিন হারিয়ে যাওয়া

ভাষারীতি হলো সাধু ভাষা।

সাধু ভাষারীতি :- পূর্বে সাহিত্য রচনা ও লেখালেখির জন্য তৎসম শব্দবহুল, দীর্ঘ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সম্পন্ন যে গুরুগম্ভীর ভাষারীতি ব্যবহৃত হতো, তাকেই সাধু ভাষা বলে। এই ভাষা অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, দুরূহ এবং এতে দীর্ঘ পদ ব্যবহৃত হয় বলে এই ভাষা কথা বলার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক না  তাই এই ভাষাতে বেশি একটা কথা বলা হয়। 

1 thought on “বাংলা ভাষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *